মঙ্গলবার | ১১ মে, ২০২১ | ২৮ বৈশাখ, ১৪২৮
সময় নিউজ ২৪ > গাইবান্ধা > কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ায় প্রসূতিকে তাড়িয়ে দিল স্বামীর পরিবার 

কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ায় প্রসূতিকে তাড়িয়ে দিল স্বামীর পরিবার 

কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ায় প্রসূতিকে তাড়িয়ে দিল স্বামীর পরিবার 
মাসুম বিল্লাহ, গাইবান্ধা: কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ায় রোকসানা খাতুন নামে এক গৃহবধূকে চার দিনের নবজাতকসহ তাড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বামীর পরিবারের বিরুদ্ধে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিলে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ নবজাতকসহ ওই মাকে উদ্ধার করলেও আশ্রয় হয়নি স্বামীগৃহে। পুলিশের সহায়তায় নিরুপায় প্রসূতি বাধ্য হয়ে নবজাতকসহ আশ্রয় নিয়েছেন গরীব বাবার বাড়িতে।
বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ) সন্ধ্যায় গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের ঘোড়ামারা গ্রামের স্বামীর বাড়ির উঠান থেকে নবজাতক ও গৃহবধূকে উদ্ধার করে পুলিশ।
জানা যায়, গত এক বছর আগে ঘোড়ামারা গ্রামের মহব্বর আলীর ছেলে রাজা মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের ধনিয়ারকুড়া গ্রামের লুৎফর মিয়ার মেয়ে রোকসানা খাতুনের। আড়াই মাস আগে রাজা মিয়া ডাক্তারি পরীক্ষা শেষে জানতে পারেন তিনি কন্যা সন্তানের বাবা হতে যাচ্ছেন। এরপর থেকে স্ত্রীর ওপর চলে নির্যাতন। নানা ছুতা ধরে মারপিট, কখনও যৌতুক চেয়ে নির্যাতন চলে আসছিল মেয়েটির উপর।
গত ৮ মার্চ প্রসব বেদনা উঠলে রোকসানাকে নেয়া হয় সালেহীন ক্লিনিক নামে রংপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় কন্যাশিশু। চারদিন সেখানে থেকে বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালের ছাড়পত্র নিয়ে দুপুরে স্বামীর বাড়ি ঘোড়ামারায় ফেরেন রোকসানা।
অভিযোগ রয়েছে, রোকসানাকে বাড়িতে ঢুকতেই দেয়া হয়নি। বাড়ির মূল ফটকে ঝুলিয়ে দেয়া হয় তালা। নবজাতকসহ সারাদিন বাড়ির উঠানে বসেছিলেন মা। পরে বিকেলে শ্বশুর ও শাশুড়ি তাকে সাফ জানিয়ে দেন, তিন মাস আগে তালাক দেয়া হয়েছে তাকে। উপায়ান্ত খুঁজে না পেয়ে সন্ধ্যার দিকে ৯৯৯-এ কল দেন রোকসানা। ততক্ষণে কোলের নবজাতকটি অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে রোকসানা ও তার নবজাতকে উদ্ধার করে। পরে তার শ্বশুর বাড়ির মূল গেটে তালা ও বাড়িতে কাউকে না পেয়ে পুলিশ তাকে সুন্দরগঞ্জের বাবার বাড়িতে পাঠায়।
রোকসানার খোঁজে সুন্দরগঞ্জের ধনিয়ারকুড়া গ্রামের বাবার বাড়িতে প্রতিবেদকের সাথে দেখা মেলে তার। এসময় তিনি সময়নিউজকে বলেন, ‘এক বছর আগে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়েছে আমার। বেবি কনসেপ্ট করার পরে যখন টেস্ট করে করে জানতে পারে মেয়ে বাচ্চা তখন থেকে আমার উপর অন্যায় অত্যাচার করতে থাকে। এক সময় স্বামী অস্বীকার করে যে, বেবি নাকি তার না। মেয়ে বাবু জন্ম হবে; এটা বোঝার পর থেকেই শ্বশুর-শাশুড়ি আর জা ওরা সবাই আমাকে নির্যাতন করছে। এক বেলা ভাত দিয়েছে আরেক বেলা দেয় নাই। এভাবে বিভিন্ন ভাবে টর্চারিং আমার উপর।
রোকসানা বলেন, আমার স্বামী ঢাকায় থাকে। দীর্ঘদিন সে যোগাযোগ না করলেও ‘আমার প্রসব বেদনার কথা জেনে পরিকল্পিত ভাবে তার (স্বামীর) ফুফুর সাথে রংপুর হাসপাতালে যেতে বলছে। চারদিন পর বাবু নিয়ে বাড়িত আসছি; বাড়ির মধ্যে আর উঠতে দেয় না। বলে যে, আমরা তোমাক ডিভোর্স দিয়ে দিছি।
রোকসানা আরোও বলেন, ‘এই চারদিনের মেয়েকে নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব? আমার বাবার গরীব মানুষ । আমি এখন কী করব একে (সন্তান) নিয়ে? কোথায় যাব? আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
রোকসানার মা ফাতেমা বেগম সময়নিউজকে বলেন, ‘মেয়ে হবে জেনে আমার মেয়েটার উপর ওরা নির্যাতন করছে। বাচ্চা হওয়ার জন্য অমপুর নিয়া গেছি। ওরা কোন খোজ খবর নেয় নাই। হামরা গরীব মানুষ, বিশ হাজার টাকা হাওলাত নিয়া চিকিসসা করছি। ওরা এক টাকাও দেয় নাই। ছল নিয়া বাড়িত গেছিলাম ওরা বাড়িত উটতে দেয়না। তালা দিয়া রাকছে গেটত।’ কয় তোমার বেটিক তালাক দিচি।’
এছাড়া রোকসানার পরিবার জানায়, বছর দুয়েক আগে রোকসানার স্বামী প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেন। এরপর সেই স্ত্রী তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যৌতুক মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এসব অভিযোগ বিষয়ে  রোকসানার স্বামী রাজু মিয়ার মোবাইল ফোন একাধিকবার ফোন করে তার কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
রোকসানার শ্বশুরের মোবাইলে ফোন করলে তার স্ত্রী আছমা বেগম সময়নিউজকে বলেন, ‘বাড়ির বউয়ের কাছে ঘনঘন বন্ধু আসে। বউয়ের চরিত্র খারাপ। তাই তাকে তিন মাস আগে তালাক দিছে আমার ছেলে।’ তিন মাস আগে তালাক দেয়া হলে এতোদিন কীভাবে আপনার ছেলের বউ আপনার বাড়িতে অবস্থান করল,  এমন প্রশ্নের জবাবে শাশুড়ি আছমা বেগম বলেন, ‘কিছু বলি নাই; পেটে বাচ্চা জন্যে। যদি কোন কিছু করে বসে।’
সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদ রানা জানান, ‌‘পুলিশ পাঠিয়ে নবজাতকসহ রোকসানাকে উদ্ধার করে তার বাবার বাড়িতে রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

কমেন্টস

Leave a comment

x