গাইবান্ধার ঢেঁকি ছাঁটা লাল চাল যাচ্ছে সারাদেশে

গাইবান্ধার ঢেঁকি ছাঁটা লাল চাল যাচ্ছে সারাদেশে

মাসুম বিল্লাহ, গাইবান্ধা: একসময় গাঁয়ের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ধান ভানা (ভাঙ্গা) জন্য ব্যবহার করা হতো কাঠের ঢেঁকি। ধানের মৌসুমে গ্রামের ধান ভানার ঢেঁকির শব্দ পাওয়া যেত হরহামেশাই। কিন্তু কালের বিবর্তনে, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এসব সনাতন ঢেঁকি এখন বিলুপ্তপ্রায়। তবে, যান্ত্রিক এই যুগেও প্রাচীন ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি ভেজালমুক্ত নিরাপদ চাল রপ্তানি করতেই বিদ্যুৎ চালিত কাঠের ঢেঁকি আবিষ্কার করেছেন গাইবান্ধার শফিকুল নামের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা এক যুবক। তার ঢেঁকির ব্যবহারে ধান থেকে উৎপাদিত চাল জেলা ছাড়িয়ে রপ্তানি হচ্ছে সারাদেশে। নিজেকে সফল উদ্যোক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন শফিকুল। কিন্তু এরজন্য প্রয়োজন সরকারিভাবে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহায়তা এবং সুদমুক্ত ঋণ। প্রশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে উদ্যোক্তদের সব ধরনের সহযোগিতার কথা জানানো হলেও গত তিন বছরেও শফিকুলের ঢেঁকি পরিদর্শন, পরামর্শ কিংবা কোনও ধরনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি সরকারি-বেসরকারি কোনও প্রতিষ্ঠান। এমনকি এগিয়ে আসেনি গাইবান্ধার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক)।

বিদ্যুৎ চালিত ঢেঁকি আবিষ্কারকারক উদ্যমী যুবক শফিকুল ইসলাম শফিকের বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের খামার বোয়ালী গ্রামে।
সরেজমিনে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দুই পাশে দুটি ঢেঁকির মাঝখানে বসে আছেন শফিকুল। ঢেঁকি দুটির কটরমটর শব্দে ভানা হচ্ছে ধান। ৫-৬ ফুট লম্বা আকারের কাঠের তৈরি দুটি ঢেঁকি চলছে একটি ইলেকট্রিক মটরের সাহায্যে। মোটরচালিত কাঠের ঢেঁকির সাহায্যে ধান কুটে তুষ ছাড়িয়ে বের হচ্ছে লাল চাল। এই ঢেঁকি দিয়ে শফিকুল প্রতিদিন গড়ে ৩-৫ মন চাল উৎপাদন করে থাকে। ঢেঁকি ছাঁটা গানজিয়া জাতের এই লাল চালের বর্তমান বাজার মূল্য প্রতিমণ ৩২০০ থেকে ৩৫০০ টাকা।

শফিকুলের ঢেঁকি ছাটা লাল চাল ইতোমধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে পুরোজেলা জুড়েই। শুধু তাই নয়, আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে অফলাইনের পাশাপাশি ফেসবুক ও অনলাইন মাধ্যমে। ঢেঁকি ছাঁটা লাল চালের ভাত খেতে অনেক সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় বেশ সাড়া ফেলেছে ক্রেতাদের মাঝে। অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনে আসছে অর্ডার। যার বেশির ভাগেই রপ্তানি হচ্ছে ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রাম জেলায়। কুরিয়ারের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এসব চাল। আর এর থেকে প্রতিমাসে শফিকুলের আয় ২৫-৩০ হাজার টাকা। সম্প্রতি তার এ কাজে স্থানীয় একজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

তরুন উদ্যোক্তা প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম শফি জানান, রাইস মিলগুলোতে চালের সৌন্দর্য্য বাড়াতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার করা হয়। যে চালের ভাত আমাদের উপকারের চেয়ে শরীরের ক্ষতিই বেশি করে। আর ঢেঁকি ছাঁটা চালে ফাইবার (আঁশ) নষ্ট হয় না। এ চালের ভাত অনেক পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত। ফলে দিন দিন এ চালের চাহিদা বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আমার ঢেঁকি ছাঁটা এই লাল চালের অর্ডার আসছে। এমনকি দেশের বাহিরে আমেরিকা, ইন্ডিয়া, মালেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি থেকেও আমি এই চালের অর্ডার পেয়েছি। কিন্তু রপ্তানি করতে পারেনি। কেননা, এরজন্য প্রয়োজন রপ্তানি পারমিশন (এক্সপোর্ট-ইম্পর্ট ট্রেড) লাইসেন্স ।
এসময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এমন একটি ঢেঁকির উদ্ভাবনে সারা দেশেই সাড়া ফেললেও, কেবল সাড়া পড়েনি গাইবান্ধার দায়িত্বশীলকর্তাদের দপ্তরে। ২০২০ সালে আমার এই ঢেঁকি ছাটা চালের যাত্রা শুরু হলেও আজও প্রশাসন কিংবা বিসিকের কোনও কর্মকর্তা আমার এই কার্যক্রম সরাসরি দেখতে আসেনি। আমি আমার এই কর্মপরিকল্পনাকে বৃহত্তর আকারে প্রসারিত করতে পাইনি কোনও পরামর্শ। অথচ ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে আমার এই সংক্রিয় ঢেঁকি ও লাল চালে। মেধা আর নিজস্ব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমি তৈরি করেছি ইলেকট্রিক ঢেঁকি। সরকারিভাবে কারিগরি সহায়তা, স্বল্প সুদে কিংবা সুদমুক্ত ঋণ সহায়তা পেলেই এটি হাজারো বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলেও জানান শফিকুল।

জানতে চাইলে জেলা বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক রবীন চন্দ্র রায় বলেন, উদ্যোক্তাদের পাশে সবসময় বিসিক রয়েছে। শফিকুলের সাথে কথা হয়েছে। তার ইলেকট্রিক ঢেঁকি পরিদর্শনে এই সপ্তাহে না হলেও আগামী সপ্তাহে আমি যাবো এবং তাকে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।

কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে এমএসসি পাশ করেন প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম ওরফে শফি। পরে বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন তিনি। চাকরি ছেড়ে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০২০ সালে আবিষ্কার করেন ইলেকট্রনিক ঢেঁকি।