বৃহস্পতিবার | ১৩ মে, ২০২১ | ৩০ বৈশাখ, ১৪২৮
সময় নিউজ ২৪ > গণমাধ্যম > সাতক্ষীরা সাংবাদিক ঐক্য পরিবারের স্বপ্নযাত্রা

সাতক্ষীরা সাংবাদিক ঐক্য পরিবারের স্বপ্নযাত্রা

সাতক্ষীরা সাংবাদিক ঐক্য পরিবারের স্বপ্নযাত্রা

এসএম শহীদুল ইসলাম: শীতের কুহেলী কেটে বসন্তের গানের মৌবনে যখন মৌমাছির গুঞ্জন, বনে বনে যখন ফুটলো কুসুম, দিকে দিকে যখন কোকিলের কুহুতান, পুষ্পে পুষ্পে যখন ভরা শাখা, কুঞ্জে কুঞ্জে যখন পাখির গান-ঠিক এমনই এক আনন্দময় পরিবেশে আলো ঝলমল বসন্ত সকালে আমরা বেরিয়ে পড়ি। আমরা মানে সাতক্ষীরা সাংবাদিক ঐক্য পরিবার। ৩১টি পরিবারের ১২৪ জন সদস্য সকাল সাড়ে ৬টায় হাজির হলাম সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব চত্ত¡রে। সকাল ৭টায় বাস ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস ছাড়লো সকাল সাড়ে ৭টায়। কোথায় যাচ্ছি আমরা? হ্যা, আমরা প্রথমে যাব ঐতিহ্যের সাক্ষী ষাটগম্বুজ মসজিদে। তারপর যাব গোপালগঞ্জের সেই সবুজ ছায়াঘেরা টুঙ্গিপাড়া গ্রামে যেখানে ঘুমিয়ে আছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর যাব অনিন্দ্য সুন্দর স্বপ্নের পদ্মাসেতু। তিনটি পৃথক বাসে আমরা ভাগ হয়ে গেলাম। আমরা সোজা বাগেরহাট অভিমুখে রওনা হলাম। আমাদের প্ল্যান ছিল এ রকম।
মহাসড়কের পিচঢালা পথ কামড়ে আমাদের বাস ছুটে চললো। আমরা একের পর এক মাঠের পর মাঠ-গ্রামের পর গ্রাম অতিক্রম করছি। হালকা গরম থাকায় জানালার গ্লাস খুলতে হলো। কাচের ভেতর থেকেই রাস্তার দুপাশে গ্রামীণ সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম।
আমার মতো অনেকের স্বপ্ন ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখার। সাতক্ষীরার সাংবাদিক ঐক্যের কল্যাণে সেই স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বাগেরহাটে অবস্থিত। ১৫ শতকের দিকে খান জাহান আলী নামের প্রখ্যাত সুফি দরবেশ এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। প্রত্নস্থলটিকে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছে। মসজিদটিতে ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। এটিকে ষাট গম্বুজ মসজিদ কেন বলা হয়, এর নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এ মসজিদটি ছাড়াও এর আশপাশে আরও বেশ কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে; মসজিদের ঠিক পশ্চিমে সুবিশাল দিঘি। দিঘির নাম ঘোড়া দিঘি। এ দিঘির নাম নিয়েও রয়েছে আরেক ইতিহাস। এছাড়াও এখানে রয়েছে জোড়া দিঘি এবং পীর খান জাহান আলীর সমাধি উল্লেখযোগ্য।
জানা গেল, দেশের অন্যতম একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ প্রসিদ্ধ। সারা বছর এখানে পর্যটকদের আনাগোনা চোখে পড়ে। হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এ অঞ্চল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। আমরা ষাটগম্বুজে পৌঁছাই, তখন সকাল সাড়ে ৯টা। প্রথমেই সিদ্ধান্ত হলো আমরা বাগেরহাট যাদুঘর দেখব। সবাই সেখানে ঢুকলাম। দেখলাম ১৫শ’ শতকের নানা রকম জিনিসপত্র। একটি কুমিরের মমিও দেখলাম সেখানে।
এরপর ষাটগম্বুজ মসজিদের ভিতর-বাহির খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতে থাকি। প্রাচীন ইমারতের চোখধাঁধানো নির্মাণশৈলী আমাদের যারপরনাই বিস্মিত করে তোলে। ষাটগম্বুজ মসজিদের খতিব মো: মুজিবুর রহমানের সাতক্ষীরার শ্রামনগর উপজেলার নওয়াবেকি এলাকায়। তিনি বলেন, মসজিদের উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া।
তিনি আরও বলেন, হজরত খানজাহান আলী (রহ.) ষাট গম্বুজ মসজিদ নির্মাণের জন্য সমুদয় পাথর সুদূর চট্টগ্রাম, মতান্তরে ভারতের ওডিশার রাজস্থান থেকে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাবলে জলপথে ভাসিয়ে এনেছিলেন। ইমারতটির গঠনবৈচিত্র্যে তুঘলক স্থাপত্যের বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ বিশাল মসজিদের চারদিকে প্রাচীর আট ফুট চওড়া, এর চার কোণে চারটি মিনার আছে। দক্ষিণ দিকের মিনারের শীর্ষে কুঠিরের নাম রোশনাই কুঠির এবং এ মিনারে ওপরে ওঠার সিঁড়ি আছে। মসজিদটি ছোট ইট দিয়ে তৈরি, এর দৈর্ঘ্য ১৬০ ফুট, প্রস্থ ১০৮ ফুট, উচ্চতা ২২ ফুট। মসজিদের সম্মুখ দিকের মধ্যস্থলে একটি বড় খিলান এবং এর দুই পাশে পাঁচটি করে ছোট খিলান আছে। মসজিদের পশ্চিম দিকে প্রধান মেহরাবের পাশে একটি দরজাসহ ২৬টি দরজা আছে। মসজিদ দর্শনীয় স্থানে রূপান্তরিত হওয়ায় সামনের আঙিনাকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে বাহারি ফুল গাছের সমারোহে। এসব গাছের নানা রকম ফুলও দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের মনে দোলা দিতে থাকে।
এরপর গোপালগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হই। মধুমতী নদী পার হতে ভেতরে ভেতরে উত্তেজেনা বোধ করছিলাম। মনে পড়ে গেল সেই অবিনাশী গানের কথা। …এই মধুমতি ধানসিঁড়ি নদীর তীরে, নিজেকে হারিয়ে আমি পাই ফিরে ফিরে…। এখানে নদীও নারীর মত কথা কয়…। সহযাত্রী মামা আমিরুজ্জামান বাবু বললেন, এত নদী দেখেও তোমার সাধ মেটে না! আমি তো জানি, নদী সভ্যতার আদি নিদর্শন। এই নদীটি আর দশটি নদী থেকে আলাদা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের শৈশবের নদী নিয়ে আমার আগ্রহ ব্যাপক। সেই সূত্রে জেনেছিলাম মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর শৈশবের নদী অসমাবতী। ভারত তাদের রাষ্ট্রের স্থপতির শৈশবের ছোট্ট নদীটিকেও যথাসাধ্য সংরক্ষিত রেখেছে। অসমাবতী পরিণত হয়েছে পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্র। কিন্তু বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশবের নদীটি যেন অনেকের অচেনা। খানিকটা অবহেলিতও বটে!

কমেন্টস

Leave a comment

x