সোমবার | ৬ এপ্রিল, ২০২০ | ২৩ চৈত্র, ১৪২৬
সময় নিউজ ২৪ > আন্তর্জাতিক > ফেব্রুয়ারি আসলে আজও নস্টালজিক হয়ে পড়েন কোচবিহারের দুই ভাষা সৈনিক

ফেব্রুয়ারি আসলে আজও নস্টালজিক হয়ে পড়েন কোচবিহারের দুই ভাষা সৈনিক

ফেব্রুয়ারি আসলে আজও নস্টালজিক হয়ে পড়েন কোচবিহারের দুই ভাষা সৈনিক

পার্থ নিয়োগী, পশ্চিমবঙ্গ (ভারত): ফেব্রুয়ারি আসলে আজও নস্টালজিক হয়ে পড়েন কোচবিহারের দুই ভাষা সৈনিক। দুজনেই বাংলাদেশের ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশের বাসিন্দা না হলেও দুজনেই আজও আবেগময় হয়ে যান ২১ ফেব্রুয়ারির কথা মনে করে। বর্তমানে এই দুই ভাষা সৈনিকই থাকেন কোচবিহারে। বছর নব্বই এর ভাষা সৈনিক মহেন্দ্র দেবনাথ ছিলেন অবিভক্ত ময়মনসিংহের ছেলে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে তিনি এক সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেবার অপরাধে পাকিস্থান সরকার তাকে জেলে পুরে রাখে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী হবার অপরাধে তাকে ৬ মাস জেল খাটতে হয়। পাকিস্তান সরকারের তরফে তার বিরুদ্ধে করা হয় অকথ্য নির্যাতন। তবুও দমান যায়নি মহেন্দ্রবাবুকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে সংগঠিত করেছেন ভাষা আন্দোলন কে। আর এই কাজ করতে গিয়েই তিনি পেয়েছিলেন মৌলানা ভাসানির সাহচর্য। একবার দুপুরবেলায় মৌলানা ভাসানীর বাড়িতে গিয়েছিলেন তিনি। আর তাকে দেখেই নিজের বাড়ির গাছের ডাব পেড়ে আনেন মৌলানা ভাসানী। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে ভারতীয় সেনার ছত্রছায়ায় মৌলানা ভাসানীর থাকার সময় তারসাথে দেখা করতে যান মহেন্দ্র দেবনাথ। তাকে দেখেই আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন মৌলানা ভাসানী। আজ এই বয়সে এসে সেই স্মৃতি নিয়েই আছেন মহেন্দ্রবাবু। ভাষা সৈনিক মহেন্দ্রবাবু কে এই সময়ের মানুষ চেনেননা কিংবা দুই বাংলার কোথার থেকে ডাক আসেনা বলেনা তার ভেতর কোন দুঃখ নেই। তবে যে বিষয় টা তাকে কষ্ট দেয় তা হল দুই বাংলা আজ আলাদা দেশ দেখে। একইসাথে তার বড় আক্ষেপ যে দেশের মাটিতে ভাষা আন্দোলন করে জেল খেটেছিলেন সেই দেশ ছেড়ে তাকে আসতে হয়েছে বলে। একই আক্ষেপ বয়ে নিয়ে চলেছেন কোচবিহারের আরেক ভাষা সৈনিক নলীনাক্ষ পাল। বাংলাদেশের ঢাকায় তার আদি বাড়ি। সেখানেই তার জন্ম। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারান তিনি। ফলে সংসার চালাতে গয়নার কাজ শিখে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজে নামেন।কবি জসীমউদ্দিন,বন্দে আলি মিয়া ও মোসলেম উদ্দিনের স্নেহধন্য ছিলেন তিনি। তাদের অনুপ্রেরনায় তিনি কিশোর বয়স থেকেই ছড়া কবিতা লিখতে শুরু করেন। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় নলীনাক্ষ পাল অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন তিনি। ৫২ এর ঢাকার রাজপথে ২১ ফেব্রুয়ারির সেই ঐতিহাসিক বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা করার মিছিলে হেটেছিলেন সেদিনের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নলীনাক্ষ পাল। আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল সেদিনের ছবি। ধর্ম, বর্ণ, ধনী, গরীব, রাজনৈতিক মতাদর্শ ভুলে যেভাবে সেদিন ঢাকার রাজপথে নেমেছিল তা বলতে গিয়ে আজও চোখে জল আসে তার। চোখের সামনেই পাকিস্তানী সেনার গুলিতে মরতে দেখেছেন সালাম, জব্বর, বরকতের মত আরও নাম না জানা ভাষা শহীদ কে। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহীনির অত্যাচারের ফলে প্রান বাচাতে এক পোশাকে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। আর ফিরে জাননি বাংলাদেশে। তবে আজও নস্টালজিক হয়ে পরেন প্রতিবেশী মুসলিম পরিবারদের ভালবাসার কথা বলতে গিয়ে। শৈশবে মা হারান তাকে প্রতিবেশী দাদি, নানী। চাচারা যে ভালোবাসায় তাকে বড় করেছেন তাদের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন ওরাই আমার সবচেয়ে আপন। স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া,অল ইন্ডিয়া লিগাল এইড ফোরাম  সহ ভারতের বিভিন্ন সংগঠন তাকে ভাষা আন্দোলনের কর্মী হিসেবে বিভিন্ন সময়ে তাকে সংবর্ধনা প্রদান করে। বাংলাদেশ থেকে কোন স্বীকৃতি না পেলেও তার কোন ক্ষোভ নেই। এই নিয়ে বলেন কোন কিছু পাবার জন্য সেদিনের ভাষা আন্দোলনে তিনি অংশ নেননি। আর যে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সেদিনের আন্দোলন ছিল তা স্বার্থক হয়েছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবার ও বাংলাদেশ স্বাধীন হবার মধ্যে দিয়ে। সেই সাথে নলীনাক্ষ বাবু বলেন, ভাষার মধ্যে দিয়েই দুই বাংলা নিজেদের বন্ধন মজবুত করুক সেটাই তিনি চান। আর ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে কোচবিহারে বসেই ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি তাদের নিয়ে নীরবে এক অন্য জগতে।    

কমেন্টস

Leave a comment