বৃহস্পতিবার | ২ এপ্রিল, ২০২০ | ১৯ চৈত্র, ১৪২৬
সময় নিউজ ২৪ > মুক্তমত > করোনা প্রতিরোধে নিয়ম মেনে চলার আহবান

করোনা প্রতিরোধে নিয়ম মেনে চলার আহবান

করোনা প্রতিরোধে নিয়ম মেনে চলার আহবান

 ✍ রুদ্র অয়ন :

দেশের জনগণের মঙ্গল কামনায় মন্ত্রিপরিষদ, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, স্বাস্থ্য এবং রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞগণের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ১০টি নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  নির্দেশনাগুলো হলো :
১. আগামী ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি রয়েছে। এরপর ২৭ ও ২৮ মার্চ সরকারি সাপ্তাহিক ছুটি। ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত পরবর্তী পাঁচ দিন পর্যন্ত সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এছাড়া ৩ ও ৪ এপ্রিলের সাপ্তাহিক ছুটি সাধারণ ছুটির সঙ্গে যোগ হবে। অর্থাৎ ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ছুটির আওতায় থাকবে। তবে কাঁচাবাজার, খাবার, ওষুধের দোকান, হাসপাতালসহ জরুরি যেসব সেবা রয়েছে তার জন্য এসব প্রযোজ্য হবে না। করোনাভাইরাস বিস্তৃতি রোধে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কারণে জনসাধারণকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ ক্রয় ও চিকিৎসা গ্রহণ ইত্যাদি) কোনোভাবেই ঘরের বাইরে না আসার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ইতিপূর্বে স্কুল ছুটি ঘোষণার পর দেখা গেছে অনেকেই দেশের বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে গিয়েছেন। সাধারণ ছুটি মানে সরাসরি আইসোলেশন না হলেও নিজেকে পৃথক রেখে অন্যকে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা।
২. এ সময়ে যদি কোনো অফিস-আদালতে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করতে হয় তাহলে তাদের অনলাইনে সম্পাদন করতে হবে। সরকারি অফিস সময়ের মধ্যে যারা প্রয়োজন মনে করবে তারাই শুধু অফিস খোলা রাখবে।
৩. গণপরিবহন চলাচল সীমিত থাকবে। জনসাধারণকে যথাসম্ভব গণপরিবহন পরিহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যারা জরুরি প্রয়োজনে গণপরিবহন ব্যবহার করবে তাদের অবশ্যই করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া থেকে মুক্ত থাকতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেই গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। গাড়ি চালক ও সহকারীদের অবশ্যই গ্লাভস এবং মাস্কসহ পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় ছুটিকালীন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সীমিত আকারে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রাখার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।
৫. ২৪ মার্চ থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে সশস্ত্র বাহিনী জেলা প্রশাসনকে সহায়তায় নিয়োজিত থাকবে। দেশের ৬৪ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাদের স্ব স্ব জেলার প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর জেলা কমান্ডারকে রিকুইজিশন দেবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে তারা জেলা ও বিভাগীয় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও সন্দেহজনক ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে।
৬. করোনা ভাইরাসের কারণে নিম্ন-আয়ের কোনো ব্যক্তি যদি স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম হয় তাহলে সরকারের যে ঘরে ফেরার কর্মসূচি রয়েছে, সে কর্মসূচির মাধ্যমে তারা নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে আয় বৃদ্ধির সুযোগ পাবে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকগণ প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।
৭. ভাসানচরে এক লাখ লোকের আবাসন ও জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। এ সময় যদি দরিদ্র কোন ব্যক্তি ভাসানচরে যেতে চান তাহলে তারা যেতে পারবেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবেন।
৮. করোনাভাইরাসজনিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় অন্যসংস্থানের অসুবিধা নিরসনের জন্য জেলা প্রশাসকদের খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এ সহায়তা প্রদান করা হবে।
৯. প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) কোরোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ৫০০ জন চিকিৎসকের তালিকা তৈরি ও তাদের প্রস্তুত রাখবে।
১০. সব ধরনের সামাজিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জনসমাগম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে অসুস্থ, জ্বর, সর্দি, কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মসজিদে না যাওয়ার জন্য নিষেধ করা হয়েছে। তারপরও সম্প্রতি মিরপুরে একজন বৃদ্ধ অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে যান। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ওই ব্যক্তি পরে মৃত্যুবরণ করেন। তাই ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের প্রতি অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে নামাজ আদায় করতে না যাওয়ার অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।

   চীনের উহান প্রদেশ থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে মৃত্যুর হার(মঙ্গলবার,২৪ মার্চ, ২০২০ ,১১:৪৯ পর্যন্ত) ১৬৫২৪ জনের। 
 করোনাভাইরাসের সর্বশেষ তথ্য প্রদানকারী ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ড ও মিটারস এর তথ্য অনুসারে, এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩ লাখ ঊনআশি হাজার ৮০ জন। আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হয়েছে ১ লাখ দুই হাজার ৪২৩ জন।
   করোনা ভাইরাস চীন থেকে ছড়ালেও সেখানে অবস্থানরত নাগরিকদরে সচেতনতার কারণে ইতোমধ্যেই স্বাভাবিক হতে চলেছে চীনের পরিস্থিতি। গত কয়েকদিনে মৃতের সংখ্যা যেমন কমেছে তেমনি কমেছে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও।
চীনের এই সুস্থ হয়ে ওঠা কোন প্রতিষেধকে নয়— বরং আটটি পরামর্শ মেনে চলায় তারা সফল হয়েছে বলে জানিয়েছেন চীনের লিয়াওংনিং প্রদেশের ডালিয়ান শহরে অবস্থান করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হাশিম রাব্বি। জনাব হাশিম জানান, করোনার কোন প্রতিষেধক এখনও আবিস্কৃত হয়নি। একমাত্র সতর্কতা অবলম্বন করলেই এই রোগ থেকে মুক্তি সম্ভব।  হাশিম বলেন, করোনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে সতর্ক থাকতে হবে। চীনা সরকার করোনা মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। তাই তারা আজ অনেকটাই সফল। আটটি পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। এগুলো আমাদের মেনে চলা আবশ্যকীয় ছিল। সেগুলো হল—
১. জ্বর. কাঁশি, সর্দি হলে তাৎক্ষণিক হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 
২. খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ। সপ্তাহে ১ দিন বাজার করতে বলা হয়েছে। 
৩. এলাকা ভিত্তিতে লকডাউন। যাতে করে করোনায় আক্রান্ত মানুষ এক এলাকা থেকে অন্য কোথাও ঢুকতে না পারে।
৪. বাইরে গেলে অবশ্যই মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক ।
৫. বাইরে থেকে এসে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে ভালভাবে হাত ধুতে হবে। 
৬. অযথা চোখে মুখে হাত দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। 
৭. মানসিক ভাবে শক্ত থাকতে হবে। 
৮. নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া এবং ব্যায়াম করতে বলা হয়েছে।
    হাশিম বলেন, বাংলাদেশে করোনা প্রতিরোধে এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাবে, বিনা চিকিৎসার জন্য মৃতের পরিমাণ বাড়বে এছাড়া মানুষ হতাশার মাঝে পরে গেলে সামাজিক অবস্থা ধংসের মুখে পরবে।তিনি বলেন, পরিবারের মানুষের কথা ভেবে হলেও বাইরে অযথা ঘোরাঘুরি থেকে দূরে থাকুন। কারণ সবথেকে ভালো উপায় হবে ভাইরাস সংক্রমণ থামানো।
প্রসঙ্গত, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর কথা জানায় জাতীয় রোগ তত্ত্ব ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর)। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মোট ৩৩ জনের মধ্যে এ ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যাদের মধ্যে মোট পাঁচজন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।আক্রান্তদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু হওয়ায় দেশে কভিড-১৯ এ তিনজনের মৃত্যুর খবর এ পর্যন্ত নিশ্চিত করল আইইডিসিআর।এর বাইরে সিলেট, খুলনা ও ভৈরবে আরও চারজন করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন জানালেও পরীক্ষা না হওয়ায় আইইডিসিআর এখনও তাদের নাম মৃতের তালিকায় আনেনি।
প্রতিকার :
এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। এই রোগ থেকে রক্ষার একমাত্র উপায় হলো অন্যদের মধ্যে ভাইরাসের সংক্রমণ হতে না দেয়া।১. আক্রান্ত ব্যক্তি হতে কমপক্ষে ২ হাত দূরে থাকতে হবে।২. বারবার প্রয়োজনমতো সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে, বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে কিংবা সংক্রমণস্থলে ভ্রমণ করলে।৩. জীবিত অথবা মৃত গৃহপালিত/বন্যপ্রাণী থেকে দূরে থাকা। ৪. ভ্রমণকারীগণ আক্রান্ত হলে কাশি শিষ্টাচার অনুশীলন করতে হবে (আক্রান্ত ব্যক্তি হতে দূরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, হাত ধোয়া, যেখানে-সেখানে কফ কাশি না ফেলা)। ৫. করমর্দন এবং কোলাকুলি না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে সহজে মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। তাই করোনা প্রতিরোধে খেতে হবে এমন কিছু খাবার যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।* অতিরিক্ত চিনি ও লবণ মেশানো খাবার খাবেন না। বাদ দিন প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার। জাঙ্ক ফুড ও তেলে ভাজা খাবার খাবেন না।
* ঘি ও মধু খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
* ডাল, দানা শস্যজাতীয় খাবার খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। 
*লেবু খেতে পারেন। রসুনও রোগ প্রতিরোধে সক্ষম, খেতে পারেন রসুনও প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েক কোঁয়া। 
* লবণ ছাড়া বাদাম, ছোলা খান, খেতে পারেন কালোজিরাও। এটি রোগ প্রতিরোধে খুব কার্যকর। 
* সজনে ডাঁটা ও সজনে ফুল ভাইরাস ঠেকাতে সক্ষম। খেতে পারেন এসব খাবার।
* টকদই, সবুজ শাকসবজি ও ফলে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এসব খাবার খেতে পারেন।
* পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন প্রতিদিন।
       করোনা প্রতিরোধে নিয়ম মেনে চলুন। নিজে সুস্থ থাকুন, অন্যকেও সুস্থ থাকতে দিন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে, সকল ধর্মের সকল মানুষকে নিরাপদ রাখুন, সুস্থ রাখুন, ভাল রাখুন। সকল মহামারী থেকে বালা-মুসিবত থেকে আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। ভাল থাকুক বিশ্ব। ভাল থাকুক বাংলাদেশ। 

কমেন্টস

Leave a comment